• Breaking News

    Sunday, October 8, 2017

    ভালবাসার পৃষ্ঠ টান

    - রিতু তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
    - জ্বি স্যার বলেন।
    - তুমি কি প্রেম কর? মানে ভালবাসার মানুষ আছে তোমার?
    পড়াতে আসার চার দিনের মাথায় এসে এমন প্রশ্নে বিব্রত বোধ করাটাই স্বাভাবিক রিতুর। রিতু এবং ওর বাসায় এসে পড়ানো শিক্ষক মঞ্জুর বয়সের পার্থক্য বড় জোর দুই বছর। রিতু পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে তাও এক বছর গ্যাপ দিয়ে, মঞ্জু তৃতীয় বর্ষের মাঝামাঝি। মঞ্জুর পড়াশুনা করা বিষয়ের নাম পদার্থ বিজ্ঞান, রিতুর বিবিএ। মঞ্জুর পড়াবার মেয়াদ তিন মাস। বিবিএর সাথে পদার্থ বিজ্ঞানের কী সম্পর্ক তা কোন ভাবেই মাথায় আসে না রিতুর। তবু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাপিয়ে দিলে কিছু করার থাকে না। পাস করার জন্য হলেও শেখা দরকার। যেই জিনিস কিছুই জানে না রিতু তাই শিখতে হচ্ছে। আর এই বিষয়ে শেখাবার জন্য বাসায় শিক্ষক হিসাবে রাখা হয়েছে মঞ্জুকে, তিন মাসের জন্য। মঞ্জুর মাঝে একটা পাগলাটে ভাব আছে, মনে হয় দিন দুনিয়ার কিছুই মঞ্জু দেখছে না, কিছুই মঞ্জুকে ভাবাচ্ছে না, আবার কথা বলার ধরণে মনে হয়, এই দুনিয়ার এমন কিছু নাই যে মঞ্জু জানে না। প্রথম এই তিন দিনেই, মঞ্জুকে বেশ ভাল লেগেছে রিতুর। একটা অজানা বিষয় যতটা সহজ করে সম্ভব শেখাবার চেষ্টা করছে মঞ্জু, যদিও মাথায় ঢুকছে না রিতুর কিছু, তবু পড়ানোর ধরণ ভাল লাগছে। মঞ্জুর কথায় রিতু বিব্রত বোধ করল না। বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলল, আছে স্যার।

    অন্য কেউ হলে হয়ত চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রিতু এই কথার মাঝে কোন উদ্দেশ্য খোঁজার চেষ্টা করত।
    মঞ্জু চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে আরাম করে বসে বলল, নাম?
    রিতু একটু এদিক ওদিক তাকাল, বুঝতে চেষ্টা করল আশেপাশে মা আছে কিনা। মায়ের এখন রান্না ঘরে থাকার কথা, রান্না ঘর থেকে এ ঘরের কথা শুনতে না পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
    রিতু বলল, আদি।
    - বেশ। তোমার ভালবাসার মানুষের কিছু খারাপ দিক বল। আবেগ থেকে না, তোমার যা যা খারাপ লাগে সত্যি তাই বল। আদি আশেপাশে নেই যে সেসব শুনে ফেলবে।
    রিতু একটু চিন্তা করল, এসব জানতে চাইবার কারণ এখনও বুঝতে পারছে না রিতু।
    রিতু উত্তর দিয়ে যায়, আমার কাছে ওর কোন খারাপ দিক নেই। সব ভাল লাগে।
    - ভেবে চিন্তে বলছ তুমি?
    - অবশ্যই স্যার।
    - তোমার বান্ধবীরাও নিশ্চয়ই, দেখতে তোমার মত সুন্দরী?
    রিতু একটু লজ্জা পেল। লজ্জা মাখা মুখে বলল, আমি সুন্দরী না স্যার। আমার বান্ধবীরা সুন্দরী।
    - এবার বল, তোমার বান্ধবীরাও কেউ তোমার ভালবাসার মানুষের কোন খারাপ দিক খুঁজে পায় না? এটা জিজ্ঞেস করলাম কারণ, ছেলে বন্ধু আর মেয়ে বন্ধুর মাঝে পার্থক্য এটাই। একটা ছেলে কখনই আরেকটা ছেলের ভালবাসার মানুষের ব্যাপারে নেগেটিভ কিছু বলবে না। বলবে, দোস্ত সেই সুন্দর মেয়েটা, চালিয়ে যা। আর মেয়ে বান্ধবী অন্য মেয়ের ভালবাসার মানুষের ভিতর পৃথিবীর যত খুঁত আছে খুঁজে বের করবে। এই ছেলের সাথে কীভাবে সম্পর্ক করলি, বলে নাক ছিটকাবে।
    রিতু মাথা নিচু করে রইল। হয়ত কিছু বলতে চাচ্ছে, আবার চাচ্ছেও না। মঞ্জু একটু উৎসাহ দিয়ে বলল, বল, দরকার আছে। বলে নেগেটিভ কিছু?
    রিতু আস্তে করে মাথা নাড়ল। মাথা নাড়াবার অর্থ দাঁড়াল, হ্যাঁ স্যার বলে।
    - কী কী বলে বল। এক এক করে বল।
    রিতু একটু ইতস্তত করছে। কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলল, আমার এক বান্ধবী বলে, এই ভালবাসা বেশীদিন টিকবে না। সব ছেলে খারাপ। আদিও ভাল মানুষ সেজে আছে, কয়দিন পর আসল চেহারা দেখব।
    - তোমাদের কত দিনের সম্পর্ক?
    - দুই বছরের একটু বেশি।
    - তাহলে এত দিনে বুঝে যাবার কথা। এমন কিছু হয়েছে তোমার?
    - না স্যার।
    - তার মানে ঐ মেয়ে নিশ্চিত কয়দিন পর পর প্রেমের সম্পর্ক পরিবর্তন করে। আজ এর সাথে কাল ওর সাথে...
    - হুম।
    - এরপর বল, আর কেউ কিছু বলে না?
    - আর একটা বলে কী, আদির চেহারায় নাকি ধান্ধাবাজের ছাপ। আমাকে ধোঁকা দিবে, বিশাল ধুরন্ধর আদি।
    - হাহা, বেশ। নিজেকে খুব পণ্ডিত ভাবা মেয়ে সে। বাদ দাও, তারপর বল।
    - কী বলব?
    মঞ্জু বেশ মজা পাচ্ছে। একটা পা চেয়ারের উপর তুলে আর একটু আরাম করে বসে বলল, আর কে কী বলে?
    - চেহারা নিয়ে আমার সব বান্ধবীর সমস্যা। আদি কালো, খাটো, আর একটু ফর্সা হলে ভাল হত। আর একটু মোটা হলে বেশ হত, আর একটু লম্বা হলে ভাল লাগত। আমি হিল পরলে ওর থেকে লম্বু হয়ে যাব।
    - তারপর?
    - তারপর আর একজন বলে, আদির পছন্দ খুবই খারাপ। জুতা, পোশাক, চশমা, হেয়ার স্টাইল সবই নাকি খ্যাত।
    - গিয়ে দেখো, ঐ মেয়ের পছন্দই সবচেয়ে জঘন্য। বান্ধবীদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্ভট জিনিস গুলোই ও পরে, আর নিজেকে খুব ফ্যাশন সচেতন ভাবে, অথচ আড়ালে ওকে নিয়েই সবাই হাসাহাসি করে।
    - জানি না।
    - আর কিছু?
    - আর একটা তো বলে, ওর হাঁটার ধরণে সমস্যা। কেমন করে নাকি হাঁটে। আবার বলে, সত্যি তুই আদির সাথে প্রেম করিস? নাকি টাইম পাস?
    - যাক বান্ধবীদের অনেক কথা শুনলাম। এবার আদির ব্যাপারে তোমার পরিবারের মতামত বল। তোমার পরিবারের লোকজন জানে ওর সাথে তোমার প্রেমের সম্পর্ক?
    - জানে না, তবে বুঝতে পারে।
    - তাদের অভিযোগ গুলো কী কী?
    - স্যার আমাকে এসব কেন জিজ্ঞেস করছেন?
    মঞ্জু এবার দুই পা তুলে, চেয়ারের উপর আসন গেড়ে বসে বলল, বল তো তুমি, দরকার তো আছে, তাই না?
    - কে বলে সেটা বলব না, তবে একজন বলে, আদিকে আমার সাথে কখনই মানাবে না। একজন বলে, আদি নাকি বেয়াদব গোছের, মুরুব্বিদের সম্মান করতে জানে না। আবার বলে, আদির ভবিষ্যৎ কী কে জানে? ফ্যামিলি অবস্থা ভাল না। আমাদের সাথে যায় না। আবার বলে, সমবয়সী বিয়ে হয় না।
    - থাক বুঝতে পারলাম।
    - এবার আমরা একটু পড়াশুনা করি, কেমন?
    রিতু মাথা নাড়ল। কিন্তু মঞ্জু এসব কেন জানতে চাইল, সে ব্যাপারে কোন উত্তর পেল না।
    মঞ্জু জিজ্ঞেস করল, তুমি জানো, পানিতে একটা জিনিস কখন ভাসে?
    - স্যার যখন কোন জিনিস পানির চেয়ে হালকা হয় তখন।
    - মোটামুটি চলে। তবে আসল ব্যাপার হল, সে সকল পদার্থের ঘনত্ব কম পানির চেয়ে তারাই পানিতে ভাসবে।
    - আচ্ছা।
    - এর বাইরেও একটা ব্যাপার আছে, জানো?
    - না স্যার।
    - সুঁই দেখেছ পানির উপর আড়াআড়ি ভাবে ছাড়লে ভেসে থাকে। কেন বলত?
    - কারণ সুঁইয়ের ঘনত্ব পানির চেয়ে কম।
    - না। সুঁইয়ের ঘনত্ব পানির চেয়ে কম না। সুঁইয়ের ঘনত্ব পানির চেয়ে বেশি। তবুও সুঁই ভাসে, কারণ সুঁইয়ের প্রতি পানির একটা টান আছে। সুঁইকে ভাসিয়ে রাখার একটা তাগিদ আছে। সুঁইকে ভাসাবার জন্য পানি নিজে থেকেই নিজের মাঝে একটা পরিবর্তন আনে, ঐ একটা টান আছে। সেই টান থেকেই। এই টানটার নাম, পৃষ্ঠ টান। যা তার উপর ভাসার কথা না, তাও সে ভাসিয়ে রাখছে। শুধু ছোট একটা টানের জন্য। তুমি তো আদিকে ভালবাস, তাই না?
    - জ্বি স্যার।
    - এত মানুষ এত কিছু বলে, তারপরও?
    - অবশ্যই।
    - কেন বাসো বলতে পারো?
    - না স্যার।
    - কারণ তোমার আদির প্রতি একটা টান আছে। সব কিছুর বিপরীতে গিয়ে, সেই টানটা কাজ করে। সত্যিকারে ভালবাস বলেই এত মানুষের এত কথা গায়ে লাগে না। শেষমেশ ঐ টান টাই জিতে যায়। একটা টানের কারণে, তুমি নিজে বদলে যাচ্ছ, সেই টানের কারণেই তুমি আদিকে ভালবাসছ। এতোটা ভালবাসছ। সত্যিকারের ভালবাসাও একটা ব্যাপার, সেটা সবাই পারে না। পানি যেমন সুঁইটাকে ভাসিয়ে রাখে পৃষ্ঠ টানে, তুমিও তেমন ভালবাসছ আদিকে ভিতর থেকে আসা একটা টানে। এই ব্যাপারটা ভাল।
    রিতু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মঞ্জুর দিকে। পৃষ্ঠ টানের ব্যাপারটা বুঝতে পারছে কিনা জানা নেই রিতুর, তবে আদির প্রতি রিতুর ভিতরের টানটা অনুভব করছে নতুন করে। একটা কিছুও ঠিক নেই রকম ছেলেটার প্রতি ভালবাসা আসছে, কোথা থেকে আসছে বলা যায় না, জানা যায় না, সব কিছুর কারণ জানাটা জরুরী না। এই পৃথিবীতে অনেক কিছুই অকারণে হচ্ছে।
    ভালবাসা বড় সস্তা জিনিস, বড় সস্তা কিছু মানুষের জন্যই। সে মানুষ গুলো কখনও যে জিনিসকে সম্মান করতে জানে নি, সে জিনিস কখনও তাদের কাছে ধরা দিবেও না এটাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিকের ভিড়ে অস্বাভাবিক কিছু মানুষ ভালবেসে যায়, সস্তা হয়ে যাওয়া ব্যাপারটাকেই বড় অমূল্য করে তুলে। ভালবাসে। অনুভব করে, হৃদয়ের কোথাও একটা টান। সে টানে দিনে রাতে, জ্যোৎস্না অমানিশায়, আলো আঁধারে, বিশ্বাসের জোরে বিলুপ্ত হতে বসা একটা ব্যাপার নির্ভয়ে বেঁচে থাকে, আর ভাবে "যাক কেউ তো আমায় ভালবাসে।" ভালবাসা ব্যাপারটাও ভালবাসা দরকার হয়, নয়ত হারিয়ে যায়, অবিশ্বাসে মুড়িয়ে পৃষ্ঠ টানের অভাবে তলিয়ে যায়, গভীরে, ধরা ছোঁয়ার অনেক বাইরে।

    No comments:

    Post a Comment