নাছিমা আমাদের স্কুলের ভ্যান ড্রাইভারের মেয়ে। ভ্যান চালকের মেয়ে হলেও, আল্লাহ তাকে অনেক সুন্দর করে বানিয়েছেন। যেন প্রতিমার সৃষ্টি করুণাময় আল্লাহর হাতে। মেয়েটি রুপে গুনে যত ছিলো মেধায় তার দ্বিগুন। তাকে ছোট থেকে দেখে এসেছি, খুবই সাধারন জীবন যাপন করেছে। যতই দুঃখ কষ্ট থাকুক না কেন, তার মুখ থেকে সর্বদা হাসির প্রলেপ লেগে থাকতো। মেয়েটির পরিবারের অবস্থা এমনি বেহাল ছিলো যে ঠিকমত দুবেলা খাবার খেতেও তাদের হায় হায় করা লাগতো।
স্কুলের জীবনে আমার অন্যতম এক বন্ধু ছিলো সে। বড় হয়ে বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখতো। স্কুলের খেলার সময়টা আমার সাথেই তার কেটে যেত। তখন আমরা ক্লাস সেভেনে পড়ি। স্কুল ছুটি হবার পর, নাছিমা আমাকে ডেকে বলল,
০- আজ বাসায় একটু পরে যাবো। আমার সাথে কোথাও ঘুরতে যাবি।
-- ঘুরতে যেতে সমস্যা নেই, কিন্তু রিক্সাভাড়া তো নেই। তাছাড়া কিছু খেতেও পারবো না। কয়েকদিন পর যাই, কিছু টাকা গুছিয়ে?
০- টাকা লাগবে না, আর খেতেও হবে না। শুধু কোন একজায়গায় গিয়ে বসে তোর সাথে কথা বলবো।
-- ঠিক আছে চল।
০- আজ বাসায় একটু পরে যাবো। আমার সাথে কোথাও ঘুরতে যাবি।
-- ঘুরতে যেতে সমস্যা নেই, কিন্তু রিক্সাভাড়া তো নেই। তাছাড়া কিছু খেতেও পারবো না। কয়েকদিন পর যাই, কিছু টাকা গুছিয়ে?
০- টাকা লাগবে না, আর খেতেও হবে না। শুধু কোন একজায়গায় গিয়ে বসে তোর সাথে কথা বলবো।
-- ঠিক আছে চল।
আমাদের স্কুল থেকে বালুরমাঠে যেতে বিশ মিনিটের মত লাগে। আমরা হাটা শুরু করলাম। বালুর মাঠে এসে অনেক গুলো জায়গা খুজে পুকুরের আইলে গিয়ে বসলাম। নাছিমা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলতে লাগলো,
-- জানিস আমার ডাক্তার হবার অনেক ইচ্ছা কিন্তু ডাক্তার হতে হলে অনেক টাকার দরকার। বাবার শরীর ভালোনা, কিছুদিন আগে বাবা আমাকে বললো, সে আমাকে পড়ালেখা করাতে পারবে না। কোন ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিবে। আমি কোনভাবেই এই অবিচার মেনে নিতে পারছিনা। তাছাড়া আমারো কিছু স্বপ্ন আছে, আমি আমার স্বপ্ন পুরন করতে চাই। তুই ছেলে বলে, দোকানে কাজ পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিস। আমাদের পরিবারের অবস্থা আর তোদের পরিবারের অবস্থা একই। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা, জীবনে কিছু করতে চাওয়াতো অপরাধ না। আমিও তোর মত নিজের পড়ালেখা, আর নিজের পরিবার কে আগলিয়ে রাখতে চাই। শুধুমাত্র আমি মেয়ে বলে কি সব কিছু এভাবে মাটিতে লুটে যাবে?
০- কোন কিছুই মাটিতে লুটাবে না। তুই কোন কাজ করতে পারবিনা এমন তো এমন তো না। আর কাজ আমি তোকে ঠিক করে দিবো। তুই রুপাকে চিনিস?
-- তোদের বস্তিতে যে থাকে তোর বন্ধু?
০- হ্যা। ও কারচুপি এর কাজ করে, আওয়াল ভাইয়ের থেকে কাজ নিয়ে। দুইদিনে একটি শাড়ির কাজ করা যায়। আওয়াল ভাই একটি শাড়ির জন্য, একশ টাকা দেয়, তুই যদি মাসে পনেরো টি শাড়ি করতে পারিস পনেরো'শ টাকা পাবি। আমাদের স্কুলের খরচ তো মাসে একশ টাকা, বাকি টাকা দিয়ে ঘরের সমস্যা দূর করেও কিছু টাকা ডাক্তার হবার জন্য রেখে দিতে পারবি।
-- খুব ভালো বুদ্ধি দিছিস। তাইলে চল এখনি রুপার সাথে দেখা করে আওয়াল ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসি
০- চল।
-- জানিস আমার ডাক্তার হবার অনেক ইচ্ছা কিন্তু ডাক্তার হতে হলে অনেক টাকার দরকার। বাবার শরীর ভালোনা, কিছুদিন আগে বাবা আমাকে বললো, সে আমাকে পড়ালেখা করাতে পারবে না। কোন ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিবে। আমি কোনভাবেই এই অবিচার মেনে নিতে পারছিনা। তাছাড়া আমারো কিছু স্বপ্ন আছে, আমি আমার স্বপ্ন পুরন করতে চাই। তুই ছেলে বলে, দোকানে কাজ পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিস। আমাদের পরিবারের অবস্থা আর তোদের পরিবারের অবস্থা একই। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা, জীবনে কিছু করতে চাওয়াতো অপরাধ না। আমিও তোর মত নিজের পড়ালেখা, আর নিজের পরিবার কে আগলিয়ে রাখতে চাই। শুধুমাত্র আমি মেয়ে বলে কি সব কিছু এভাবে মাটিতে লুটে যাবে?
০- কোন কিছুই মাটিতে লুটাবে না। তুই কোন কাজ করতে পারবিনা এমন তো এমন তো না। আর কাজ আমি তোকে ঠিক করে দিবো। তুই রুপাকে চিনিস?
-- তোদের বস্তিতে যে থাকে তোর বন্ধু?
০- হ্যা। ও কারচুপি এর কাজ করে, আওয়াল ভাইয়ের থেকে কাজ নিয়ে। দুইদিনে একটি শাড়ির কাজ করা যায়। আওয়াল ভাই একটি শাড়ির জন্য, একশ টাকা দেয়, তুই যদি মাসে পনেরো টি শাড়ি করতে পারিস পনেরো'শ টাকা পাবি। আমাদের স্কুলের খরচ তো মাসে একশ টাকা, বাকি টাকা দিয়ে ঘরের সমস্যা দূর করেও কিছু টাকা ডাক্তার হবার জন্য রেখে দিতে পারবি।
-- খুব ভালো বুদ্ধি দিছিস। তাইলে চল এখনি রুপার সাথে দেখা করে আওয়াল ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসি
০- চল।
আমি আর নাছিমা সেখান থেকে উঠে, আমাদের মোল্লা বস্তির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেখানে গিয়ে রুপাকে সাথে নিয়ে আওয়াল ভাইয়ের কাছ থেকে কারচুপি কাজের শাড়ি এবং বিভিন্ন কাজের জিনিস নিয়ে আসলাম। আওয়াল ভাই আমার আর রুপার গ্যারান্টি তে কাজ দিতে রাজি হলেন।
নাছিমা কে তাদের বাসায় দিয়ে আমি আর রুপা বাসায় আসতে ছিলাম। রুপার চোখে আমার জন্য রাগ দেখলাম, আমার সাথে কথা বলছে না, তার মাথায় থাপ্পড় দিয়ে বললাম,
০- কিরে ভুতুম পেচার মত মুখ করছিস কেন?
-- তুই স্কুলে যাইয়া পড়ালেখা করোস নাকি সারাদিন মেয়েদের সাথে আড্ডা দেস।
০- পড়ালেখা করতে যাই। আর জানোস তো আমার কন্যা রাশি তাই মাইয়ারা আমার দিকে একটু দুর্বল।
-- ঝাড়ু পেটা করি তোর কন্যারাশির। বেশি মেয়েদের সাথে মিশবি না তুই!
০- মিশলে কি হইবো?
-- আমি মইরা যামু।
০- কিরে ভুতুম পেচার মত মুখ করছিস কেন?
-- তুই স্কুলে যাইয়া পড়ালেখা করোস নাকি সারাদিন মেয়েদের সাথে আড্ডা দেস।
০- পড়ালেখা করতে যাই। আর জানোস তো আমার কন্যা রাশি তাই মাইয়ারা আমার দিকে একটু দুর্বল।
-- ঝাড়ু পেটা করি তোর কন্যারাশির। বেশি মেয়েদের সাথে মিশবি না তুই!
০- মিশলে কি হইবো?
-- আমি মইরা যামু।
রুপার কথা শুনে আমি চুপসে গেলাম। মেয়েটি সেদিন আমাকে কি বুঝাতে চেয়েছিলো। রুপার বয়সের তুলনায়, কাজকর্ম আর কথাবার্তা অনেক ভারী ছিলো। যা আমার ছোট্ট বয়সে বোঝার ক্ষমতা ছিলোনা। আমিও সেদিন ঠাট্টা স্বরুপ বলে ফেলেছিলাম। মরে গেলে শিন্নি খাইতে পারুম, মরার আগে আমারে খবর দিস।
রুপা কোন কথা না বলে, চটাস করে আমার গালে চর বসিয়ে দ্রুত পায়ে হেটে গেলো বাসায়। আমি রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখনো। হঠাৎ পেছন থেকে রাশেদ ডাক দিলো,
০- ঐ কই যাস?
-- বাসায় যাইতে ছিলাম।
০- মাইয়াডা কেডা?
-- আমাগো বস্তিতে থাকে। আমার বন্ধু
০- আচ্ছা সিটিমাঠে চল আজকে ফুটবল খেলমু।
-- নারে দোস্ত দোকানে যাইতে হইবো একটু পর। শুক্রবারে যামু খেলতে।
০- ঐ কই যাস?
-- বাসায় যাইতে ছিলাম।
০- মাইয়াডা কেডা?
-- আমাগো বস্তিতে থাকে। আমার বন্ধু
০- আচ্ছা সিটিমাঠে চল আজকে ফুটবল খেলমু।
-- নারে দোস্ত দোকানে যাইতে হইবো একটু পর। শুক্রবারে যামু খেলতে।
রাশেদের কাছে কথা গুলো বলে বাসায় গিয়ে গোসল করে দোকানের উদ্দেশ্যে বের হতে যাবো, এর মধ্যে রুপা হাতে প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কথা না বলে পাশ কাটিয়ে আসতে চাইলাম। পেছন দিক দিয়ে আমার কলার টেনে মাটিতে বসিয়ে দিলো। সে আজ আলুর পরোটা বানিয়েছে, আলুর পরোটা ছিড়ে আমার মুখের সামনে তুলে ধরলো। সে প্রতিদিন আমার যাবার সময় কিছু না কিছু খাইয়ে দিতো। মা বাসায় থাকতো, না বাবাও থাকতো না। সে জানে আমি না খেয়েই কাজে চলে যাবো তাই প্রতিদিন আমাকে খাওয়ানোর দায়ীত্বটা রুপাই নিয়েছিলো। আমি না খেয়ে গোমুখ করে বসে আছি, সে হাত দিয়ে কয়েকবার মুখে ঠেলে দিলো, কিন্তু আমি নিলাম না। পরোক্ষনেই চোখের পানি গলগল করে ছেড়ে দিলো। তার চোখের ভাষা আমি ভালোই বুঝলাম সে আমাকে খাবার অনুরোধ জানাচ্ছে, সাথে আমাকে চড় মারার জন্য সে নিজেও কষ্ট পেয়েছে। আমি খাবার মুখে নিলাম। আমাকে খাইয়ে দিতে লাগলো খাওয়া শেষে আমি কিছু না বলে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে বুঝে গেলো, আমার কাছে টাকা নেই। সে ব্যাগ বের করে আমাকে দশ টাকা দিয়ে বললো,
০- হিসেব করে রাখিস একদিন চুকিয়ে দিবি।
০- হিসেব করে রাখিস একদিন চুকিয়ে দিবি।
আমি মাথা নাড়িয়ে সেখান থেকে চলে আসলাম। এই পর্যন্ত রুপার থেকে কত টাকা নিয়েছি তার হিসেব কিভাবে করবো। সে যতবার আমাকে খাইয়ে আমার ক্ষুদা নিবারণ করেছিলো তার মুল্যই আমি কি করে দিবো। একটু দূরে গিয়ে পেছন ফিরে তাকালাম। রুপা দাঁড়িয়ে আছে, আর আমি জানি সে ততক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবে যতক্ষন আমাকে দেখা যাবে। তার এসব পাগলামি কেন করে আমি তা বুঝতাম না। কিন্তু অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করতো তার এমন কর্মকান্ড দেখে।
।
২
।
আমার, নাছিমার, রুপার জীবন এক মাপ কাঠিতে চলতে লাগলো। আমি আর নাছিমা কাজের পাশাপাশি পড়ালেখা করলেও রুপা তা করতো না। সে শুধু কাজই করতো। আমাদের স্কুল জীবন এভাবেই শেষ হলো। নাছিমা আর আমি কলেজে ভর্তি হলাম। এখন আমাদের ব্যস্ততা আরো বেড়ে গেলো। পড়ালেখার চাপ বেড়ে গেলো। এরই মধ্যে রুপার মা মারা গেলে রুপা খুব ভেংগে পরলো। তার মা আর নানী ছাড়া কেউ ছিলোনা। সিদ্ধান্ত হলো রুপা তার নানী সহ তাদের গ্রামে চলে যাবে। সেখানে তার মামার টেইলার্স আছে, সে টেইলার্স এর কাজ করবে। আমি, নাছিমা, রুপা, রাশেদ চারজন দাঁড়িয়ে ছিলাম। রুপা আমার হাতে একটি মাটির ব্যাংক থামিয়ে দিলো , "এই ব্যাংকটা তখন ভাংবি যখন তুই খুব সমস্যায় থাকবি। এর আগেনা"
।
২
।
আমার, নাছিমার, রুপার জীবন এক মাপ কাঠিতে চলতে লাগলো। আমি আর নাছিমা কাজের পাশাপাশি পড়ালেখা করলেও রুপা তা করতো না। সে শুধু কাজই করতো। আমাদের স্কুল জীবন এভাবেই শেষ হলো। নাছিমা আর আমি কলেজে ভর্তি হলাম। এখন আমাদের ব্যস্ততা আরো বেড়ে গেলো। পড়ালেখার চাপ বেড়ে গেলো। এরই মধ্যে রুপার মা মারা গেলে রুপা খুব ভেংগে পরলো। তার মা আর নানী ছাড়া কেউ ছিলোনা। সিদ্ধান্ত হলো রুপা তার নানী সহ তাদের গ্রামে চলে যাবে। সেখানে তার মামার টেইলার্স আছে, সে টেইলার্স এর কাজ করবে। আমি, নাছিমা, রুপা, রাশেদ চারজন দাঁড়িয়ে ছিলাম। রুপা আমার হাতে একটি মাটির ব্যাংক থামিয়ে দিলো , "এই ব্যাংকটা তখন ভাংবি যখন তুই খুব সমস্যায় থাকবি। এর আগেনা"
আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা জানালাম। রুপা আমার হাত ধরে আমাকে একটু আড়ালে নিয়ে গেলো, তার শ্যামবর্ণের রুপে গড়া মুখের অধলিভাগ অংশে লালজোড়া ঠোট দিয়ে একে দিলো আমার কপালে, গালে, ঠোটে চুমুর লেপটে। সে আমাকে চুমু দিচ্ছে আর কাঁদছে। তার চোখের পানিতে আমার গাল ভিজে গেলো। এই প্রথম আমার মাঝে কষ্ট অনুভব হয়েছিলো রুপার জন্য। না চাইতেও আমি আমার চোখের জল ছেড়ে দিলাম। আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
০- আর কোনদিন দেখা হবে কিনা জানিনা, কিন্তু তোর জন্য প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যেন তোকে সুখে রাখে। আমি যশোর নাভারন যাচ্ছি সেখানেই আমাদের গ্রাম। পারলে কোনদিন আসিস।
০- আর কোনদিন দেখা হবে কিনা জানিনা, কিন্তু তোর জন্য প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে দোয়া করবো যেন তোকে সুখে রাখে। আমি যশোর নাভারন যাচ্ছি সেখানেই আমাদের গ্রাম। পারলে কোনদিন আসিস।
এই কথাটুকু বলে আর কিছু সে বলতে পারলোনা। আমাকে জরিয়ে ধরলো, আমি তাকে সামনে এনে তার চোখের পানি মুছে দিলাম। হাত ধরে সবার সামনে আসলাম, রাশেদ আর নাছিমা দূর থেকেই এসব দেখতেছিলো। তারা কিছু বললো না, এরই মধ্যে রুপার নানী চলে আসলো টেম্পু ভাড়া করে। রুপা উঠে বসলো, একনয়নে তার চলে যাওয়া দেখছিলাম। আমার চোখ থেকেও পানি ঝরছে ঝরছে রুপার চোখেও। প্রথমবার রুপা দূরে যাবার কষ্ট হতে লাগলো। বুকের ভিতর কষ্ট গুলো দুমরে মুচরে এক করে দিতে লাগলো।
আমি সেখান থেকে চলে গেলাম। নাছিমা আর রাশেদ কে রেখে। আড়ালে গিয়ে প্রথম একটি সিগারেট কিনে ধরলাম। প্রথম বার টান দিয়েছিলাম নিকোটিনের ধোয়াতে। প্রতিটি ধুয়ার সাথে রুপার কথাই মনে হচ্ছিলো। রুপা চলে গেলো, আমাকে খাইয়ে দেবার মানুষ আর নেই, পকেট এ টাকা না থাকলে কেউ টাকা দিয়ে বলবে না, হিসেব করে রাখিস।
।
৩
।
আমি আর নাছিমা এই ঝরের মাঝেই আমাদের পড়ালেখা চালিয়ে গেলাম। কলেজ শেষ হবার পথে, রুপা চলে গেছে বছর দুই ঘনিয়ে আসলো। রাশেদ আমি নাছিমা, এবার ইন্টার পরীক্ষার্থি। সবাই মনোযোগ দিয়ে পরালেখা করলাম। আমাদের কোন টিচার ছিলো না, বা আমরা কোচিং করতাম না তাই আমরা তিনজন পরীক্ষার সময় একসাথে পড়তাম। আমরা তিনজনই ছিলাম একই বস্তির ছেলে মেয়ে। তাই সবাই নাছিমার বাসায় গিয়ে পরতাম। আমাদের মধ্যে রাশেদ ছিলো এতিম। তার বাবা মা নেই, সে কোনদিন দেখেওনি তাদের, বস্তির রহিম ভাই তাকে লালনপালন করতেন। রাশেদ একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করেই পরালেখা করতো। আমি দোকানে কাজ করে, আর নাছিমা কারচুপির কাজ করে।
।
৩
।
আমি আর নাছিমা এই ঝরের মাঝেই আমাদের পড়ালেখা চালিয়ে গেলাম। কলেজ শেষ হবার পথে, রুপা চলে গেছে বছর দুই ঘনিয়ে আসলো। রাশেদ আমি নাছিমা, এবার ইন্টার পরীক্ষার্থি। সবাই মনোযোগ দিয়ে পরালেখা করলাম। আমাদের কোন টিচার ছিলো না, বা আমরা কোচিং করতাম না তাই আমরা তিনজন পরীক্ষার সময় একসাথে পড়তাম। আমরা তিনজনই ছিলাম একই বস্তির ছেলে মেয়ে। তাই সবাই নাছিমার বাসায় গিয়ে পরতাম। আমাদের মধ্যে রাশেদ ছিলো এতিম। তার বাবা মা নেই, সে কোনদিন দেখেওনি তাদের, বস্তির রহিম ভাই তাকে লালনপালন করতেন। রাশেদ একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করেই পরালেখা করতো। আমি দোকানে কাজ করে, আর নাছিমা কারচুপির কাজ করে।
আমাদের পরীক্ষা খুব ভালো হলো, ভালো রেসাল্ট নিয়ে আসলাম। আমি আর নাছিমা সাইন্স নিয়ে পড়লেও, রাশেদ আর্টস নিয়ে পড়তো। এবার আমরা আমাদের স্বপ্নের সিড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। নাছিমা হতে চায় ডাক্তার আমি ইঞ্জিনিয়ার, আর রাশেদ উকিল।
আমরা ভার্সিটি কোচিং করার আগ্রহ প্রয়াস করলাম এতদিন আমাদের কোন কোচিং না করেও পাড় হয়ে আসলেও, এবার বিশ্ববিদ্যালয় সুযোগ পেতে হলে অবশ্যই করতে হবে। সবাই সবার মা বাবা কে জানালাম। তারা যথাসাধ্য মত টাকা দিলেন। আমার মা ৩ হাজার টাকা দিয়েছিলেন, তাও সুদে এনে, চার মাস লাগবে এই টাকা শোধ করতে, সবারই এমন অবস্থা ছিলো। কিন্তু আমরা কখনো হাড় মানিনি, আমরা তিনজন একজোট হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কোচিং এর টিউশন ফি পুরো হতে আরো নয় হাজার টাকা দরকার আছে। তখন আমার মনে পড়লো রুপার দেওয়া মাটির ব্যাংকের কথা। আমি রাশেদ, নাছিমা বাসায় গিয়ে ব্যাংক টা বের করে, তা ভেংগে ফেললাম। মাটির ব্যাংক ভাংগতেই আমাদের চোখ চোরকগাছ হয়ে উঠলো।
১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকার অনেক গুলো নোট। তার সাথে একটি সাদা চিঠি। চিঠিটা হাতে নিলাম, এলোমেলো হাতের লেখা, এধরনের লেখাকে আমরা বাজে হাতের লেখা বলি। আর বানানও অনেক ভুল। আমি এমন লেখা দেখে বুঝে গেলাম, এটা রুপা ছাড়া আর কেউ না। আমি পড়তে শুরু করলাম,
নজরুল,
আজকে তোর টাকার অনেক দরকার তাই ব্যাংক ভেংগেছিস। এখানে যে টাকা আছে তাতে হয়ত তোর সমস্যা দূর হবে। যদি তোর সমস্যা দূর না হয় তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিস। জানিস আমার মায়ের আলসার হয়ে ছিলো। আমি প্রতি মাসের আয়ের টাকা কে দুই ভাগে ভাগ করতাম, এক মায়ের জন্য আর তোর জন্য। দুইটা ব্যাংকে আলাদা আলাদা করে টাকা জমাইতাম। মায়ের যখন আলসার হইলো, তখন মায়ের জন্য রাখা ব্যাংক ভেংগে তাকে চিকিৎসা করাইছি, ডাক্তার বলেছিলো আরো টাকা দরকার মাকে সুস্থ করতে। আমি যদি সেদিন তোর নামে জমানো টাকা ডাক্তার কে দিতাম, তাহলে হয়ত মা বেচে থাকতো। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিলো আমি যদি এমন টা করি তাহলে আমি আমার দেওয়া ওয়াদা ভেংগে ফেলবো। আর ওয়াদা ভাংলে আমি কাফের হয়ে যাবো।
আজকে তোর টাকার অনেক দরকার তাই ব্যাংক ভেংগেছিস। এখানে যে টাকা আছে তাতে হয়ত তোর সমস্যা দূর হবে। যদি তোর সমস্যা দূর না হয় তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিস। জানিস আমার মায়ের আলসার হয়ে ছিলো। আমি প্রতি মাসের আয়ের টাকা কে দুই ভাগে ভাগ করতাম, এক মায়ের জন্য আর তোর জন্য। দুইটা ব্যাংকে আলাদা আলাদা করে টাকা জমাইতাম। মায়ের যখন আলসার হইলো, তখন মায়ের জন্য রাখা ব্যাংক ভেংগে তাকে চিকিৎসা করাইছি, ডাক্তার বলেছিলো আরো টাকা দরকার মাকে সুস্থ করতে। আমি যদি সেদিন তোর নামে জমানো টাকা ডাক্তার কে দিতাম, তাহলে হয়ত মা বেচে থাকতো। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিলো আমি যদি এমন টা করি তাহলে আমি আমার দেওয়া ওয়াদা ভেংগে ফেলবো। আর ওয়াদা ভাংলে আমি কাফের হয়ে যাবো।
জানিস নজরুল? তোকে না আমি অনেক ভালোবাসি। কোনদিন কি আসবি আমারে দেখতে। তোর সাথে এত মাইয়া আমি দেখতে পারিনা। এই মাইয়াগুলা তোরে এত পছন্দ করে ক্যা? জানিস আমার অনেক কান্না পায় তুই যখন কারো সাথে কথা বলোস। যাক এ কথা আশা করি তোর সমস্যা দূর হইবো। নজরুল, ইংলিশে জানি কি কয় ভালোবাসার মানুষ রে, আমিও তোরে "আই লাভ ইউ করি"। দোয়া করি ভালো থাকিস।
চিঠিটা পড়তে পড়তে আমাদের তিন জনেরই চোখ বেয়ে পানি পরলো। আমি বোবা হয়ে গেলাম, রুপার এমন কর্মকাণ্ড দেখে, এত ভালোবাসা, এত শ্রদ্ধা, এত ভক্তি আমি কোনদিন দেখিনি। চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু পারিনি, বোবা পাথর হয়ে শুধু পানি ঝরিয়েছি চোখের। নাছিমা আমার চোখের পানি মুছে দিলো, রাশেদ কে জড়িয়ে ধরলাম আমি পেছন দিক দিয়ে নাছিমা আমাকে জরিয়ে ধরলো। আজ তিন বস্তির মানুষ আরেকজন বস্তির মানুষের ভালোবাসা, আত্মত্যাগ, ভক্তি দেখে কেঁদে যাচ্ছে একে অপরের গলা জরিয়ে।
।
৪
।
রুপার টাকা আমাদের টাকা এক করে আমরা কোচিং এ ভর্তি হলাম। কঠোর পরিশ্রম আর একান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে নেমে পড়লাম যুদ্ধে। আমাদের পরীক্ষা শুরু হলো, প্রতিটি পরীক্ষার পর একটি দোয়া ছিলো আমাদের অন্তরে, তা হচ্ছে আমরা যেন সুযোগ পাই বিশ্ববিদ্যালয় এ। কারন পাবলিক ছাড়া আমাদের আর কোন রাস্তা নেই। স্বপ্ন পুরন, আর জীবনের সুন্দর ভবিষ্যৎ এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারবে। পরীক্ষার ফলাফল আসলো, আল্লাহ আমাদের নিরাশ করেন নি, আমাদের চেষ্টা, অনুগত্য, আল্লাহর উপর ভরসা, আর পরিশ্রম কোনটাই বিফল এ যায়নি। নাছিমা, ঢাকা মেডিক্যাল, আমি বুয়েট, আর রাশেদ ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে সুযোগ পেলাম। ঠিক তেমনি করে সব হয়েছিলো যেমনটি করে আমরা চেয়েছিলাম, যেমন করে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
।
৪
।
রুপার টাকা আমাদের টাকা এক করে আমরা কোচিং এ ভর্তি হলাম। কঠোর পরিশ্রম আর একান্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে নেমে পড়লাম যুদ্ধে। আমাদের পরীক্ষা শুরু হলো, প্রতিটি পরীক্ষার পর একটি দোয়া ছিলো আমাদের অন্তরে, তা হচ্ছে আমরা যেন সুযোগ পাই বিশ্ববিদ্যালয় এ। কারন পাবলিক ছাড়া আমাদের আর কোন রাস্তা নেই। স্বপ্ন পুরন, আর জীবনের সুন্দর ভবিষ্যৎ এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারবে। পরীক্ষার ফলাফল আসলো, আল্লাহ আমাদের নিরাশ করেন নি, আমাদের চেষ্টা, অনুগত্য, আল্লাহর উপর ভরসা, আর পরিশ্রম কোনটাই বিফল এ যায়নি। নাছিমা, ঢাকা মেডিক্যাল, আমি বুয়েট, আর রাশেদ ঢাকা ইউনিভার্সিটি তে সুযোগ পেলাম। ঠিক তেমনি করে সব হয়েছিলো যেমনটি করে আমরা চেয়েছিলাম, যেমন করে পাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।
আমাদের আনন্দ কে দেখে, মোল্লা বস্তিতে আনন্দের ঢেউ উঠলো, এই প্রথম এই বস্তি থেকে তিনজন এতদুর এগিয়েছে। বস্তির মালিক মোল্লা সাহেব নিজে এসে আমাদের আশির্বাদ দিয়ে গেলেন। শত হলেও আমরা ভবিষ্যৎ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল। চারিদিকে আমাদের তিনজনের জয়গান। কিন্তু আমরা তিনজনই ছিলাম রুপার কাছে ঋনী। আমাদের সাফল্যের অনেক বড় একটি অংশ জুড়ে রুপা রয়েছে।
আজ আমরা আমাদের স্বপ্ন পুরন করেছি। আজ আমরা সমাজের পরিপুর্ন একটি অংশ। এর মধ্যে অনেকবার রুপাকে আমরা আলাদা আলদা ভাবে খুজেছি কিন্তু পাইনি। আজ আমরা তিন জন, চট্টগ্রাম যাচ্ছি। আমি, রাশেদ, নাছিমা। একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আর উকিল সাহেব, যাদের সাফল্যের পিছনে রয়েছে এক সাধারন মেয়ের নিঃস্বার্থ ত্যাগ, ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা। যার কাছে, আমরা সবাই ঋনী। যার ঋন শোধ হবার নয়। রুপা এখন চিটাগাং এ আছে, যশোর থেকে অনেক আগেই চিটাগাং চলে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তার আসল ঠিকানা পেয়েছি। আমরা যাচ্ছি রুপার কাছে, আমাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করতে, তার হিসেব করা পাওনা ফিরিয়ে দিতে। আমাদের সকলের মাঝে একটু ভয়, একটু উদ্দীপনা, অপরিসীম ভালোবাসা, হাজারো কোটি শ্রদ্ধা নিয়ে যাচ্ছি রুপার কাছে। সে কেমন দেখতে হয়েছে? বিয়ে হয়েছে কি? সে এখন কি করে? নাকি আজো আমার অপেক্ষা করতেছে, আমি আসবো তাকে ভালোবেসে ঘরে তুলে নিয়ে যাবো, তার নাম দিবো ভালোবাসার কালো পরী। জানিনা কি হবে, অপেক্ষা শুধু রুপাকে সামনে পাবার।
।
।

No comments:
Post a Comment